ঢাকা মঙ্গলবার
১৬ জুলাই ২০২৪
১৭ মার্চ ২০২৪

যে জন্য অতীতের স্মৃতির সময়গুলো বেশি সুন্দর


ডেস্ক রিপোর্ট
221

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০২২ | ১১:১১:০৭ এএম
যে জন্য অতীতের স্মৃতির সময়গুলো বেশি সুন্দর ফাইল-ফটো



জানো কি অনেক যুগ চলে গেছে? মরে গেছে অনেক নৃপতি? অনেক সোনার ধান ঝরে গেছে জানো না কি? -জীবনানন্দ দাশ।

পরিবার, বন্ধুদের সাথে বসলে, আলোচনাগুলো বেশিরভাগ সময় দেখা যায় অতীতের দিকে চলে যায়। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অতীতের স্মৃতিময় দিনগুলির আলোচনা করে আনন্দ পাই। ভবিষ্যৎ বা বর্তমান যেমনই হোক না কেন ‘সোনালী দিনগুলি’ কেবল অতীতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়।

হাইস্কুলে থাকতে হয়তো শৈশবের কথা ভেবে মনে হতো প্রাইমারি স্কুলের দিনগুলো আরো সহজ, সুন্দর ছিল। মনে হতো শৈশবের সেসব স্মৃতিই মজাদার ছিল। তখন হাইস্কুলের নানারকম চিন্তাভাবনাই মনে হতো কঠিন, আগের গুলো সহজ। আবার, কলেজে মনে হতো হাইস্কুল অনেক সহজ ছিল, সেদিনগুলো অনেক আনন্দের। আর এই পিছুটানের চক্র সারাজীবনই চলতেই থাকে আমাদের।

[caption id="attachment_6946" align="aligncenter" width="745"]ফাইল-ফটো ফাইল-ফটো[/caption]

এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরিক্ষেত্র যত ধাপই অতিক্রম করি না কেন, আগের স্মৃতি সবসময়ই সহজ ও আনন্দময় বলে অনুভূত হয়। অথচ, যখন জীবনের ঐ সময়গুলো পার করছিলাম, তখন সেই সময়ের থেকে কঠিন সময় কখনোই যেন পার করিনি বলে মনে হতো। জীবনের সব ধাপেই, বর্তমান নয় বরং অতীতকে বেশি সোনালী মনে হতো। অতীতেই যেন সবকিছুই সহজ ও সুন্দর ছিল।

কিন্তু কেন অতীতকে বর্তমানের চেয়ে ভালো মনে হয়? এর পেছনে কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে কি? ১৯৮৮ সালে জার্নাল অফ পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজির একটি গবেষণাপত্রে টরি হিগিন্স এবং চার্লস স্ট্যাঙ্গোরের গবেষণায় এই ঘটনা ঘটার পেছনে একটি সম্ভাবনা উঠে আসে। উদাহরণস্বরূপ, যখন মানুষ বলে যে কোনো একটি কনসার্ট চমৎকার, তখন তারা বোঝায় যে এটি সেই সময় পর্যন্ত তাদের দেখা অন্যান্য সকল কনসার্টের তুলনায় চমৎকার।

[caption id="attachment_6949" align="aligncenter" width="734"]ফাইল-ফটো ফাইল-ফটো[/caption]

টরি হিগিন্স এবং চার্লস স্ট্যাঙ্গোর যুক্তি দেন যে মানুষ যখন অতীতের ঘটনাগুলো সম্পর্কে চিন্তা করে, তখন তারা সেই ঘটনার মূল্যায়নটি শুধু মনে রাখে, কিন্তু সেই মূল্যায়নের কারণটি নয়। অর্থাৎ ঘটনাটি কি তাদের কাছে ভালো ছিল নাকি মন্দ ছিল সেটুকুই মনে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কেউ হাইস্কুলে পড়া একটি কনসার্টের কথা চিন্তা করে, তাদের মনে আছে যে তারা মনে করেছিল কনসার্টটি চমৎকার, কিন্তু ভুলে যায় যে তাদের এই রায়টির ভিত্তি ছিল হাইস্কুল পর্যন্ত দেখা সমস্ত কনসার্টের ভিত্তিতে। যদি তারা সেই একই কনসার্ট একজন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখে, যখন তাদের অভিজ্ঞতা বেশি, তাহলে তারা হয়তো ভাববে না যে কনসার্টটি এত বেশি চমৎকার।

এজন্য, পূর্বে কোনো একটি ঈদ, পুজো, নববর্ষ বা কোনো উৎসব আমাদের নিকট যত চমৎকার লাগতো, তা ছিল সেই বয়স পর্যন্ত উৎযাপন করা অন্যান্য সকল উৎসবের সাপেক্ষে চমৎকার। যার ফলে স্বল্প অভিজ্ঞতার দরুন, উৎসবগুলোর মূল্যায়ন আমাদের কাছে ছিল অনেক বেশি, আর আমরা সেই মূল্যায়নটিই শুধু মনে রেখেছি।

[caption id="attachment_6950" align="aligncenter" width="769"]ফাইল-ফটো ফাইল-ফটো[/caption]

আমরা যখন আমাদের জীবনের অতীতের ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমরা অনেক কিছু চমৎকার, বা অসাধারণ, বা উজ্জ্বল হিসেবে মনে রাখতে পারি। কেবল ভুলে যাই যে আমরা কীভাবে সেই ঘটনাগুলো শ্রেষ্ঠত্ব বা উজ্জ্বলতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে অভিজ্ঞতার বিস্তৃত ভিত্তির সাথে, আমাদের সত্যিকার অর্থে অনেক আনন্দিত, চমকপ্রদ হতে অনেক বেশি উত্তম কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন জিনিসগুলি বেশি ভালো ছিল।

এরপর আরেকটি বিষয় হচ্ছে সময়ের পার্থক্য। বেশ খানিকটা গবেষণায় দেখা যায় যে, আমরা সুদূর অতীতের কথা অনেক বেশি বিমূর্তভাবে ভাবি, যেখানে বর্তমানের কথা  অনেক স্পষ্ট আর সূক্ষ্মভাবে ভাবতে হয়। এ মুহুর্তে ঘটছে এমন অনেকগুলো ঘটনার সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিরক্তির অনুভূতি জড়িত, যা আপনাকে দৈনন্দিন জীবনে চলাচল করার জন্য মোকাবেলা করতে হবে। যেমন: সামনে কোনো পরীক্ষা, বিল পরিশোধ করা, কাপড় ধোয়া বা ঘর পরিষ্কার করা ইত্যাদি আরও দৈনন্দিন বিষয়-আশয়। অন্যদিকে, যখন আপনি অতীত সম্পর্কে চিন্তা করেন, তখন এসব ক্ষুদ্র বিরক্তিগুলির কথা মনে আসে না। আপনি যা ভাবেন তা হলো আপনার কাটানো দুর্দান্ত, মনে রাখার মতো সময়গুলো।

অন্যদিকে যখন আপনি অতীতের ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকান, আপনি জানেন যে সেগুলির পরিণতি কী হয়েছিল। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে কোনো ঘটনায় অনিশ্চয়তা আমাদের মনে চাপ সৃষ্টি করে। উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা কাজ করে যখন আমরা কোনোকিছু সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকি, যখন জানি না যে কোনো ঘটনার ফলাফল কোনদিকে মোড় নেবে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও খারাপ সময় কেটে গেলে অনেকটাই সয়ে আসে, যখন আমরা এর ফলাফল সম্পর্কে অবগত। এজন্যে বর্তমান প্রায়ই অতীতের চেয়ে কম আনন্দদায়ক মনে হয় আমাদের, কারণ আমরা প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছি কীভাবে কী ঘটবে, তা এবার পরীক্ষার ফলাফলই হোক বা কোনো চাকরির ইন্টারভিউ।

[caption id="attachment_6947" align="aligncenter" width="810"]ফাইল-ফটো ফাইল-ফটো[/caption]

যখন আপনার অতীতের কথা চিন্তা করেন, আপনি পরবর্তীতে কী ঘটতে চলেছে তার সম্পূর্ণ অনুভূতি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে সেদিকে ফিরে তাকান। আপনি বন্ধুদের সাথে কিছু মজার সময়, বা একটি পেশাদারী সাফল্যের দিকে ফিরে তাকালে, এবং সেই মজার সময়গুলোর কথা স্মরণ করলে নিশ্চিতভাবে জানেন কোন ঘটনার পর কী ঘটেছে। কিন্তু বর্তমান মুহূর্তে, আপনি এটি করতে পারবেন না কারণ জীবন অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা, অস্বস্তি এবং চাপে পূর্ণ।

আমাদের জীবনে, আমরা নিশ্চয়তা আকাঙ্ক্ষা করি। কিন্তু কেউ শতভাগ আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাদের বলতে পারবে না যে কখন কী ঘটবে। কিন্তু আমাদের এই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় বর্তমানে প্রতিনিয়ত, যার কারণে অতীতের নিশ্চয়তা অনেকটাই সুখকর।

[caption id="attachment_6951" align="aligncenter" width="752"]ফাইল-ফটো ফাইল-ফটো[/caption]

আমাদের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের অবাক হওয়ার জন্যে ঘটনার অনন্যতাও অধিক লাগে। অতীতে যখন আপনি বয়সে ছোট এবং অভিজ্ঞতায় কম, তখন প্রথমবারের মতো অনেক বিষয় অনুভব করা নিত্য-বিষয়, এবং সেই প্রাথমিক অভিজ্ঞতা আপনার জীবনে পরবর্তী অভিজ্ঞতাগুলোর জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। প্রথম অভিজ্ঞতা সবসময়ই অনন্য এবং অদ্বিতীয়; বিশেষ এই অনুভূতির সাথে তুলনা করলে পরবর্তী জীবনে একইরকম অভিজ্ঞতাও ফিকে লাগে। যার ফলে আমাদের মনে এমতাবস্থা একধরনের প্রত্যাশা তৈরি করে দেয়, যা আমাদের বর্তমান অভিজ্ঞতাগুলির সাথে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার তুলনার দিকে ধাবিত করে।

তবে এর মানে কি এই যে বর্তমান মুহূর্তগুলো আনন্দের নয়? না, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বর্তমানও অতীতের তুলনায় বেশি আনন্দের হতে পারে। এর অর্থ শুধু এই যে, হয়তো আপনি বর্তমান মুহুর্তটিকে অতীতের সাথে তুলনা করছেন, যা আপনাকে অতীতে হয়তো প্রথমবারের মতো একটু বেশিই অবাক করেছিল। অতীত কখনই চাপমুক্ত ছিল না যেমনটি ফিরে তাকানোর সময় মনে হয়। অন্যদিকে, বর্তমান অনেক সময়ই আপনি যা অনুভব করছেন তার চেয়ে অনেক বেশি ভাল হতে পারে অতীতের তুলনায়।


আরও পড়ুন: